টার্গেটই ছিল সম্পর্কে টানাপড়েন দূরীকরণ তথা আস্থা-বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বার খোলা। কিন্তু না, পারস্পরিক উদ্বেগ আদান-প্রদানেই বৈঠকটি শেষ হলো! বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার যেকোনো বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকের চেষ্টা চলছে গত সেপ্টেম্বর থেকে। ব্যাংককে বিমসটেক সামিটে উভয়ের দেখা হবে এটি ছিল নিশ্চিত। কিন্তু তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক নিয়ে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। ভারতীয় মিডিয়া ছিল ক্রিটিক্যাল। কিন্তু ঢাকা ও দিল্লির কূটনীতিকরা ছিলেন আশাবাদী। তারা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন বৈঠকটি হওয়া উচিত এবং হবেও। এ নিয়ে যে উভয়ের প্রস্তুতি ছিল সেটি বৈঠকের ছবি এবং ভিডিওতে দৃশ্যমান। ৮ই আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর শুক্রবারই প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইড লাইনে উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা করলেন তারা। দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কে নানা ইস্যু থাকে, এটি আছেও। কিন্তু সেই বৈঠকে মুখ্য আলোচ্য হয়ে উঠে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি। বিচারের জন্য বাংলাদেশ তাকে ফেরত চাইবে এমনটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু এর জবাবে ভারত কী বলেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আলোচনায় বিষয়টি যে গুরুত্ব পেয়েছে তা নিশ্চিত করেছেন দিল্লির বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ইউনূস-মোদি বৈঠকে সুনির্দিষ্টভাবে কী আলোচনা হয়েছে তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত খোলাসা করেনি কোনো পক্ষই। তবে ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে, হাসিনার ফেরতের বিষয়টি মুখ্য আলোচ্য হয়ে ওঠায় অন্য অনেক ইস্যুতে ফোকাস কমেছে। হাসিনাকে ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আগেই আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়। প্রত্যর্পণ নিয়ে দিল্লি ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।
বৈঠক বিষয়ে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি ব্রিফ করেন। সেখানো ইতিবাচক অনেক কথা আছে। কিন্তু ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউনূস-মোদি বৈঠক নিয়ে যে বার্তা প্রচার করেছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তাদের উদ্বেগকেই ফোকাস করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত ওই বার্তার সার কথা হলো- প্রথমত, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক চায় ভারত। ড. ইউনূসের সঙ্গে আলাপে সেই আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন মোদি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি ‘চরমপন্থার উত্থান চেষ্টা’ রোধ। বাংলাদেশে চরমপন্থার উত্থান ঘটতে পারে- এটি দেশটির মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি বেশ কিছু দিন ধরে বলে আসছে। এবারই প্রথম ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তা ঠেকানোর কথা বললো এবং তা তাদের ডকুমেন্টে রাখলো। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আলোচনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক খারাপ হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান জানান। নরেন্দ্র মোদি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ভারত এমন এক গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায় যেখানে নির্বাচনের একটি ভূমিকা রয়েছে। ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে ইউনূস-মোদি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এমনটা জানান। দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের বার্তা এবং বিদেশ সচিবের সংবাদ ব্রিফিংয়ে আগামী দিনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরীয় ওই জোটকে এগিয়ে নিতে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করবে তাতে সমর্থন-সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স, বিবিসি এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমসের অনলাইন ভার্সনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ইউনূস-মোদি বৈঠকের রিপোর্ট যথাযথ গুরুত্বে স্থান পেয়েছে। সেসব রিপোর্টে দিল্লির বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রিকে উদ্ধৃত করা হয়। সেসব রিপোর্টে সম্পর্কে প্রভাব ফেলে এমন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলতে ঢাকার প্রতি দিল্লির পরামর্শের কথা তুলে ধরা হয়। তাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন স্পর্শকাতর ইস্যু যেমন সেভেন সিস্টার্স এবং সীমান্ত সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সর্বশেষ চীন সফরে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। যা নিয়ে ভারত জুড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে ড. ইউনূস সৎ উদ্দেশ্যে ওই বক্তব্য দিয়েছেন, যার ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চলছে।
সূত্র: মানবজমিন।