ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উপলক্ষ্যে গত ২৩ জুন সোমবার সন্ধ্যায় ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’ এর উদ্যোগে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে “পলাশী ট্র্যাজেডি ও আজকের বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কবি আহমেদ ময়েজ, স্বাগত বক্তব্য রাখেন অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলনের আহবায়ক হাসনাত আরিয়ান খান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শামসুল আলম লিটন।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক সুরমা’র প্রধান সম্পাদক ফরীদ আহমেদ রেজা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মামনুন মোর্শেদ ও অধ্যাপক আবদুল কাদির সালেহ। অতিথি হিসেবে কানাডা থেকে আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি অংশ নেন লেখক ও ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক ড. তাজ হাশমী।
আলোচনায় আরো অংশ নেন দৈনিক সিলেটের ডাক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাসন, সাবেক কাউন্সিলর লেফটেন্যান্ট (অব:) ইমরান আহমেদ চৌধুরী, স্পেকট্রাম রেডিও ইউকের পরিচালক মিছবাহ জামাল, গবেষক ড. কামরুল হাসান, দৈনিক আমার দেশ এর নির্বাহী সম্পাদক (আবাসিক) অলিউল্লাহ নোমান, লেখক ও গবেষক শেখ আখলাখ আহমেদ, সাংবাদিক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট বদরুজ্জামান বাবুল, ইন্জিনিয়ার মুগনি চৌধুরী ও মানবাধীকার কর্মী হাসনাত হাবীব প্রমূখ।
সভা সঞ্চালনা করেন সাপ্তাহিক সুরমা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মিনহাজুল আলম মামুন ও সানরাইজ টুডে সম্পাদক এনাম চৌধুরী।
স্বাগত বক্তব্যে হাসনাত আরিয়ান খান অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পটভূমি তুলে ধরেন এবং নবাবী বাংলা ফিরে পেতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “এ মাটি আমার, এ মাটি আপনার। এ মাটি আমাদের সবার। আমরা ছেড়ে দিবো না এ মাটির অধিকার। তিনি আরও বলেন, “প্রকৃতপক্ষে পলাশীর প্রহসনের যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা একা পরাজিত হননি, পরাজিত হয়েছিলো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার জনগণ। এই পরাজয়ের গ্লানি আমাদের মুছতে হবে।” তিনি পলাশী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৪ এর জুলাই গণবিপ্লবকে বেহাত হওয়া থেকে রক্ষা করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে শামসুল আলম লিটন বলেন, “আজ ২৩ জুন, এই তারিখটি আমাদের জীবনে একটি কলঙ্কিত দিন। এই দিনে আমাদের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। শুরু হয় দাসত্বের এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা একজন অল্পবয়সী, সাহসী, স্বাধীনচেতা শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও লুটতরাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশীয় কিছু ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্রের কাছে হার মানেন । এটি ছিলো বিদেশি শক্তির সঙ্গে দেশীয় বেঈমানদের যুগলবন্দির এক ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র। পলাশীর যুদ্ধ শুধু একটি পরাজয় ছিলো না, এটি ছিলো আমাদের জাতীয় আত্মমর্যাদার পরাজয়।
অতিথি হিসেবে আলোচনা সভায় ড. তাজ হাশমী বলেন, “পলাশী যুদ্ধে তথ্য ও প্রযুক্তি, রণকৌশল, সিপাহশালারদের বেঈমানী – বড় দাগে ছিলো বিশ্বাসের ঘাটতি। সেনাপ্রধান মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো বাকী সব ব্যবস্থাপনা। তিনি আরো বলেন, “আমরা যেভাবে ইতিহাসটা পড়ি তার প্রভাব পড়েছে আমাদের চিন্তাধারায়। আমাদের দেশে যার ডাক্তারী, ইন্জিনিয়ারিং, ইকোনোমিস্ট পড়েন তাদের সাথে ইতিহাসের পরিচয় হয় না। আমাদের দেশের মেডিকেল পড়ুয়ারা বলবে আমি ডাক্তারী পাশ করবো, আমি আবার ইতিহাস পাঠ করবো কেনো?” তিনি দেশের মানুষের ইতিহাস চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মামনুন মোর্শেদ বলেন, নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, প্রজাবৎসল নবাব। চরম বাঙালি বিদ্বেষী বর্ণবাদী রবার্ট ক্লাইভের কুটচাল এবং কিছু বিশ্বাসঘাতকের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পলাশীর প্রান্তরে তাঁর পতনের মধ্যে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা সূর্যের অস্ত ঘটে।
অধ্যাপক আবদুল কাদির সালেহ বলেন, “১৭৫৭ সাল থেকে আজকে ২০২৫ সাল, পলাশীর যে ট্র্যাজেডি, তার যে শিক্ষা তা আজও কিন্তু সমানভাবে আমাদের জন্য প্রযোজ্য। সেজন্যই বার বার পলাশী আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে আসে। তার আলোচনা খুব জরুরি হয়ে ওঠে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরীদ আহমেদ রেজা বলেন, “আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমাদের নতুন প্রজন্ম যারা আছে, যারা ইতিহাস বিস্মৃত, তাদেরকে ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আরো বড় পরিসরে করতে হবে। তবে শুরু করার জন্য আমি অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন এর আহবায়ক হাসনাত আরিয়ান খানকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁর কারণেই আজকে আমরা এই সমাবেশে জড়ো হতে পেরেছি।
নজরুল ইসলাম বাসন বলেন, “আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে, স্বল্প সময়ের একটি ছোট যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক লুন্ঠনের এক অধ্যায়। শুধু বাংলার স্বাধীনতা নয়, হারিয়ে যায় এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
স্পেকট্রাম রেডিও ইউকের পরিচালক মিছবাহ জামাল বলেন, “ইতিহাসের পরতে পরতে আমরা যেসব ভুল করেছি, সেসব ভুল থেকে আজো আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। ইতিহাস থেকে যদি শিক্ষা না নেওয়া হয়, তবে তা বারবার ফিরে আসে ভিন্ন রূপে।
গবেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, “আমাদের ইতিহাসকে আমরা এত বেশি আড়ালে রাখি.. যেন ভুলেই গেছি! অথচ এগুলো বেশি বেশি চর্চিত হবার বিষয়! ইতিহাস যখন আমরা চর্চা করি তখন নতুন জিনিস আমরা আনতে পারি না।
লেখক শেখ আখলাখ আহমেদ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে এম আর আখতার মুকুলের পঠিত চরমপত্র শোনার পরামর্শ দিয়ে বলেন, “ন্যারেটিভ জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৭১ এর পরে অনেক বয়ান তৈরী হয়েছিলো। কিন্তু ২৪ এর জুলাই বিপ্লবের পরে কোন বয়ান তরী হয়নি। পলাশীর পরেও কোন বয়ান তৈরী হয়নি। আমরা বয়ান তৈরীতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদেরকে ন্যারেটিভ তৈরী করতে হবে।”
সাবেক কাউন্সিলর লেফটেন্যান্ট (অব:) ইমরান আহমেদ চৌধুরী বলেন, “পলাশীর যুদ্ধ, এটা কোনো যুদ্ধ ছিলো না। সব কিছু একটা ষড়যন্ত্রের ফসল। কিন্তু এই সময়কে একাডেমিকভাবে তুলে ধরা হয়নি।
দৈনিক আমার দেশ এর নির্বাহী সম্পাদক (আবাসিক) অলিউল্লাহ নোমান বলেন, “আমরা এখনো পরাধীনতার কবল থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। সেই পরাজয়ের রেশ এখনও আমাদের সমাজে বিদ্যমান—রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে। আমাদের মসলিন, তাঁতশিল্প বা লোকশিল্প আজো যথার্থভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়নি।
ইন্জিনিয়ার মুগনি চৌধুরী ইসরায়লে ইরান যুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মানবাধীকার কর্মী হাসনাত হাবীব বলেন, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় কোনো সাধারণ সামরিক ব্যর্থতা ছিল না; এটি ছিল ষড়যন্ত্র, বিভাজন, দুর্নীতি, নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও জনসচেতনতার অভাবের এক নিষ্ঠুর পরিণতি—যার ছায়া আজও আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে স্পষ্ট।
সাংবাদিক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট বদরুজ্জামান বাবুল দেশে ও প্রবাসে বসবাসরত বুদ্ধিজীবীদের অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলনের সাথে আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে কবি আহমেদ ময়েজ বলেন, “আমি সবার বক্তব্য খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছি এবং সবার বক্তব্য নোট করেছি। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ হয়েছে। এর মাঝে গঙ্গা-ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টাও হয়েছে অনেক। ইংরেজ ও তাদের দোসররা মিলে দেশি-বিদেশি ফরমায়েশি লেখক ও তথাকথিত গবেষক দিয়ে ইতিহাস মুছে ফেলার কসরতও কম হয়নি। তিনি বলেন, ইতিহাস কারো কৃতদাস হয় না। তাই দেরিতে হলেও সত্য ইতিহাস বেরিয়ে এসেছে। আমাদেরকে এখন নতুন করে ইতিহাস লিখতে হবে। ইংরেজদের লিখিত ইতিহাস, ইংরেজদের লিখিত বয়ানকে চ্যালেন্জ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে দর্পণ টিভির পরিচালক রহমত আলী, কবি কাইয়ুম আবদুল্লাহ, ড.মুহাম্মাদ মুঈনুদ্দীন মৃধা, সাংবাদিক শেখ মুহিতুর রহমান বাবলু, ইক্যুয়াল রাইটস ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট সাংবাদিক মাহবুব আলী খানশূর, মানবাধীকার কর্মী ইউসুফ হোসাইনসহ কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভা শেষে পলাশী থেকে আজ পর্যন্ত দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, সেসব বীর শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। আলোচনা সভায় ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’ এর একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।