ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

জুবায়ের আহমেদ:: ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহ্ত্তম রাষ্ট্র ইউক্রেন এখন বিশ্বের অন্যতম পরা শক্তি রাশিয়ার আক্রমণের স্বীকার।রাশিয়ার বোমায় লন্ডভন্ড হচ্ছে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর। ঘরবাড়ি,হাসপাতাল, স্কুল থেকে শুরু করে ধর্মীয় উপসানালয়ও ছাড় পাচ্ছেনা রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় শরনার্থী সংকট দেখা দিয়েছে ইউরোপে। ১ মাসের উপর হলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে না।মাত্র এক মাসে ১ কোটির উপর ইউক্রেনীয়ান বাস্তুহারা হয়েছেন। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী হামলায় এখন পর্যন্ত শিশুসহ ৯৭৭ জন বেসামরিক লোক নিহিত হয়েছেন। জানমাল রক্ষায় এরই মাঝে প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন এর উপর ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে আশেপাশের দেশে আশ্রয় গ্রহন করেছেন।

পুর্ব ইউক্রেনের দুই বিদ্রোহী এলাকা দনেৎস্ক এবং লুহানস্ক কে স্বীকৃতির মাধ্যমেই আসলে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে। সেখানে ‘শান্তি বাহিনী’ পাঠানোর নাম করে এখন পোরু ইউক্রেন দখল করে নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে পুতিন বাহিনী। স্বাধীনতার মূল্য যে কত,তা এখন যুদ্ধেলিপ্ত ইউক্রেনীয়দের চেয়ে বেশি আর কেউ বুঝবে না।এই জন্যই বলা হয়ে থাকে,” স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করাই সব চেয়ে বড় চ্যালেন্জ”।ইতিমধ্যে, যুক্তরাজ্য,যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ সহ জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন,ইউরোপীয় কমিশন থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা সংস্হা একের পর এক রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে।

তবে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কোন কিছুরই পরোওয়া করছে না।বরং যুদ্ধ থামাতে পুতিন ইউক্রেন কে তিনটি শর্ত দিয়েছেন। সেগুলো হল:- ১) ইউক্রেন নেটো সামরিক জোটে যোগ দিতে পারবে না, ২) ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ইউক্রেন কে মেনে দিতে হবে, ৩) দনেৎস্ক এবং লুহানস্ক পৃথক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। বিশ্বে রাশিয়া ছাড়াও আরেক পরাশক্তি চীন তার প্রতিবেশি তাইওয়ান কেও তার অংশ বলে মনে করে,তাইওয়ান এর স্বাধীনতা কে অস্বীকার করে। কাশ্মীর কে ভারত তাদের অংশ মনে করে, কাশ্মীরিদের স্বায়ত্বশাসন কে অস্বীকার করে, এসকল দাবীকে কঠোর হাতে দমন করে।

ভারত তার প্রতিবেশি দেশগুলোকে কন্ট্রোল করতে চায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের দিকে আছে ভারতের লোলুপ দৃষ্টি। চারদিক থেকে ভারত ঘেরা একটা ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের মাথা ব্যাথার কারণ। বিশেষ করে ভৌগলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্স্থানে থাকা বাংলাদেশ কে তারা কব্জা করতে সর্বদা তৎপর। ভারতীয় নেতারা অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর।মাঝেমধ্যে ভারতীয় নেতারা বাংলাদেশ দখল করে নেয়ার হুমকি দেন। মনের অজান্তেই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের মনের কথা বেরিয়ে আসে মুখ ফসকে ।এই তো গত অক্টোবরে ভারতীয় শাসক দলের উপদেষ্টাদের অন্যতম সাংসদ সুব্রামনিয়াম স্বামী “ভারতের বাংলাদেশ দখল করে নেয়া উচিত” বলে টুইটার টুইট করেছেন।তার অভিযোগ বাংলাদেশে নাকি হিন্দুদের নির্যাতন করা হচ্ছে। তার জানা থাকা উচিত বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ।একটা দেশের শাসক দলের উপদেষ্টার অপর আরেকটি স্বাধীন দেশ নিয়ে এমন মন্তব্য হাল্কাভাবে নেয়ার কেন সুযোগ নেই। অথচ ভারতের তাবেদার বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার তার এমন মন্তব্যের কোন প্রতিবাদ জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।

ভারতের বহুদিনের আশা বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর সুবিধা পাওয়া।সেটা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের চট্রগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে ভারত। সড়ক,রেল,নৌ পথ ব্যবহার করার অনুমোদন পেয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছে তাদের দালাল বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে।নিজ দেশের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে আওয়ামীলীগ সরকার এ রকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে।এতে বাংলাদেশের কোন লাভ না হলেও ষোল আনা লাভ কেবল ভারতেরই হয়েছে। বাংলাদেশ কে নিজের কব্জায় রাখার জন্য সব রকম চাল খেলছে আসছে ভারত বাংলাদেশ জন্মের পর থেকেই।সে উদ্দেশ্য এদেশে তাদের গোয়েন্দা সংস্হা “র” সর্বদা তৎপর। ভারত বিরোধী কোন আন্দোলন হলে সেটা ভন্ডুল করাই তাদের কাজ।

ভারত বিরোধী নেতাদের গুম করার পেছনে “র” এর হাত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পেছনে “র” জড়িত বলে মনে করা হয় । কারণ তিনি ভারতের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বিএনপির আরেক কেন্দীয় নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার পর ভারত থেকে উদ্ধার করা হয়। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ৫৩ দিন নিঁখোজ থাকার পর ভারতীয় সীমান্ত থেকে উদ্ধার হন। দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ফরহাদ মজহার অপহরন হওয়ার পর তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।এ রকম অসংখ্য ঘটনার সাথে ভারতের হাত রয়েছে। বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বাহিনী গঠন ও পরিচালনায় “র” জরিত আছে বলে ধারনা করা হয়।সেখানে শান্তি বাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়ে “র” সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছ।ভারত বাংলাদেশ কে তার ইচ্ছামত ব্যবহার করতে চায়। সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও তার কিছু যায় আসে না।

ভারত শেখ হাসিনার মত পুতুল সরকারের মাধ্যমে তার সব ধরনের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।বিনিময়ে শেখ হাসিনা সরকার কে ভারত ক্ষমতায় থাকতে সব ধরণের সমর্থন দিয়ে আসছে। যেটা তারা স্বাধীন সিকিম এ একজন লেন্দুপ দর্জির মাধ্যমে করেছিল।শেষ পর্যন্ত সিকিম কে ভারতের অংশই করে ফেলা হয়। ভারত বাংলাদেশের জনগন নয় বরং শুধু আওয়ামীলীগকেই তাদের বন্ধু মনে করে।ঠিক তেমনিভাবে রাশিয়াও ইউক্রেন এ তার পুতুল সরকার দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে আসছিল। আর যখনই ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতায় আসল এখন সে দেশ কে ধংস্ব করে দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশকে সিকিম ও ইউক্রেন থেকে শিক্ষা গ্রহন করে হবে। বাংলাদেশের জনগনকে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। বাংলাদেশ কে রক্ষা করতে এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

জুবায়ের আহমেদ

সাংবাদিক,কলামিষ্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

error: