দেশে তালাক বেড়েছে, প্রধান কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক

বর্তমানে দেশে বিয়ের হার বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে তালাকও। আর এর প্রধান কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবনে বনিবনার অভাব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন জরিপ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২ (এসভিআরএস)- এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি গত ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। এতে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে তিন লাখের বেশি পরিবার।

এসভিআরএসে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি হাজারে বিবাহের হার এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ দেখা গেছে। পল্লী অঞ্চলে বিবাহের হার শহরাঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। পল্লী অঞ্চলে হাজারে বিয়ের হার ১৯ দশমিক পাঁচজন এবং শহরে ১৩ দশমিক আটজন। বৈবাহিক অবস্থার বিচারে জনসংখ্যার ৬৩ দশমিক নয় শতাংশ মানুষ বর্তমানে বিবাহিত এবং ২৮ দশমিক সাত শতাংশ মানুষ কখনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। অবশিষ্ট সাত দশমিক চার শতাংশ মানুষ বিধবা বিপত্নীক ও তালাকপ্রাপ্ত। নারীদের মধ্যে বিধবা তালাকপ্রাপ্তের ভাগ তাদের পুরুষ সমকক্ষ অর্থাৎ বিপত্নীক/তালাকপ্রাপ্তদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি, যথাক্রমে ১২ দশমিক ছয় শতাংশ ও এক দশমিক নয় শতাংশ।

বিবাহের বয়স সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে সম্প্রতি বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রথম বিবাহের গড় বয়স কিছুটা নিম্নমুখী। পুরুষদের বিবাহের বয়স ২০১৮ সালে ছিল ২৪ দশমিক চার বছর যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ বছরে। পক্ষান্তরে, নারীদের বিবাহের গড় বয়স ২০১৮ সালে ছিল ১৮ দশমিক ছয় বছর, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক চার বছরে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোরীদের জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক/বাল্যবিবাহ একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। কেননা ১৫ বছরের পূর্বে এবং ১৮ বছরের পূর্বে বিবাহের হারে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ১৫ বছরের পূর্বে বিবাহ ২০২২ সালে বেড়ে হয়েছে ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ; যা ২০১৮ সালে ছিল চার দশমকি ছয় শতাংশ। ১৮ বছরের আগে নারীদের বিবাহের হার ২০২২ সালে ৪০ দশমিক নয় শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা ২০১৮ সালে ৩০ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে দুই দশমিক ১৮ শতাংশ পয়েন্ট করে বেড়েছে।

অপরদিকে ২০২২ সালে বিগত বছরের তুলনায় তালাকের হার দ্বিগুণ হয়েছে। বছরে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় তালাক হচ্ছে এক দশমিক চারজনের, যা ২০২১ সালে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় ছিল শূন্য দশমিক সাতজন। পল্লী ও শহর উভয় এলাকায় এ বৃদ্ধির হার একই আদলে হয়েছে। দাম্পত্য বিচ্ছিন্নের হারও ২০২২ সালে বেড়েছে। প্রতি হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৯ জনের দাম্পত্য বিচ্ছেদ হচ্ছে যা ২০২১ সালে শূন্য দশমিক ১৩ জন।

বিবিএস বলছে, তারা বিচ্ছেদ হওয়া মানুষের নিবিড় সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপ করেছে। ফলে এই জরিপের মাধ্যমেই বিচ্ছেদের আসল কারণ উঠে এসেছে।

তালাকের কারণ
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। জরিপে উত্তরদাতাদের প্রায় ২৩ শতাংশ এই কারণ সামনে এনেছেন। এরপর রয়েছে দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা বা বনিবনার অভাব ২২ শতাংশ।

ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অসামর্থ্য অথবা অস্বীকৃতি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন অক্ষমতা বা অনীহা ইত্যাদিও রয়েছে বিবাহবিচ্ছেদের কারণের তালিকায়।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ হয়েছে ঢাকা বিভাগে, কম ময়মনসিংহ বিভাগে।

দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতায় বিবাহবিচ্ছেদ বেশি বরিশালে, কম সিলেটে।

ভরণপোষণ দিতে অসমর্থতার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি রাজশাহীতে, কম চট্টগ্রামে।

পারিবারিক চাপে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি ময়মনসিংহে, কম ঢাকায়। নির্যাতনের কারণেও বিবাহবিচ্ছেদ বেশি হয়েছে ময়মনসিংহে, কম রাজশাহীতে।

যৌন অক্ষমতা অথবা অনীহার কারণে রংপুরে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি হয়েছে। বরিশালে এ ক্ষেত্রে হার শূন্য।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তালাকের ঘটনা বেশি ঘটছে সিলেটে।

বিবিএসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মুসলমানদের মধ্যে তালাকের ঘটনার কারণগুলো জাতীয় হারের মতোই। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলাদা হওয়ার কারণের দিক দিয়ে ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আলাদা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ দাম্পত্যজীবন বজায় রাখতে অক্ষমতা ও শারীরিক নির্যাতন।

যেমন শারীরিক নির্যাতনকে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মুসলমানদের ১০ শতাংশের কম। হিন্দুদের ক্ষেত্রে হারটি ২০ শতাংশের কাছাকাছি।

বিবিএসের পরিসংখ্যানের বাইরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন সাধারণত বেশি করেন নারীরা। ২০২২ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে সাত হাজার ৬৯৮টি। এর মধ্যে স্ত্রীরা আবেদন করেছিলেন পাঁচ হাজার ৩৮৩টি, যা মোট আবেদনের ৭০ শতাংশ। ঢাকা উত্তরের চিত্রও প্রায় একই। সেখানে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের ৬৫ শতাংশ নারীই করেছেন।

error: